শীতে জ্বর, সর্দি ও কাশি থেকে নিরাপদ থাকার উপায়
শীতকাল এলেই আমাদের আশপাশে পরিচিত কিছু উপসর্গ দেখা দিতে
শুরু করে—নাক
দিয়ে পানি পড়া, গলা ব্যথা, কাশি, শরীর ব্যথা বা হালকা জ্বর। অনেকেই ভাবেন, শীতে তো
এগুলো হবেই। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টা পুরোপুরি সত্য নয়। শীতকালে
কিছু নির্দিষ্ট কারণে এই সমস্যাগুলো বেশি দেখা দিলেও, সঠিক সচেতনতা ও যত্ন নিলে এগুলো
অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।শীতকালে বাতাস শুষ্ক ও ঠান্ডা থাকে। ফলে আমাদের নাক ও শ্বাসনালীর
ভেতরের আবরণ সহজেই শুষ্ক হয়ে যায়। এই আবরণই মূলত ভাইরাস ও জীবাণুর বিরুদ্ধে শরীরের
প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। যখন এটি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন রাইনোভাইরাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা
ভাইরাস বা অন্যান্য শ্বাসনালীর ভাইরাস সহজেই সংক্রমণ ঘটাতে পারে। এর ফলেই দেখা দেয়
সর্দি, কাশি ও জ্বর।
কেন শীতে এই সমস্যাগুলো বেশি হয়:
শীতে
মানুষ সাধারণত ঘরের ভেতর বেশি সময় থাকে এবং জানালা–দরজা বন্ধ থাকে। এতে ঘরের ভেতরে বাতাস চলাচল কমে যায় এবং
একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে সহজেই অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি ঠান্ডার
কারণে আমরা অনেকেই পানি কম পান করি, যা শরীরকে ধীরে ধীরে পানিশূন্যতার দিকে নিয়ে যায়।
এই পানিশূন্যতাও শ্বাসনালীর স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ
বিষয় হলো, শীতে অনেকেরই পর্যাপ্ত ঘুম হয় না এবং শরীরচর্চার পরিমাণ কমে যায়। এর ফলে
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে, যা সংক্রমণের
ঝুঁকি বাড়ায়।
কীভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখবে:
প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বিষয় হলো নিজেকে উষ্ণ রাখা। বিশেষ করে মাথা, গলা ও বুক ভালোভাবে ঢেকে রাখা দরকার।
সকালে বা রাতে ঠান্ডা বাতাসে বের হলে স্কার্ফ বা মাফলার ব্যবহার করা উপকারী।
দ্বিতীয়ত, পর্যাপ্ত পানি
পান করা অত্যন্ত জরুরি। শীতকালে তৃষ্ণা কম লাগলেও দিনে অন্তত দুই থেকে আড়াই লিটার
তরল গ্রহণ করা উচিত। কুসুম গরম পানি, হালকা গরম চা কিংবা স্যুপ শ্বাসনালী আর্দ্র রাখতে
সাহায্য করে এবং কাশি কমাতে সহায়ক।
তৃতীয়ত, খাদ্যাভ্যাসের দিকে
বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। ভিটামিন সি ও জিঙ্ক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা
করে। লেবু, কমলা, আমলকি, পেয়ারা, শাকসবজি ও ডাল নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত।
পাশাপাশি প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে।
ওষুধ প্রসঙ্গে কিছু সতর্কতা:
শীত এলেই অনেকেই নিজের ইচ্ছেমতো
অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া শুরু করেন, যা মোটেও সঠিক নয়। মনে রাখতে হবে, সাধারণ সর্দি
ও কাশির বেশিরভাগই ভাইরাসজনিত, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই। প্রয়োজনে
প্যারাসিটামল দিয়ে জ্বর নিয়ন্ত্রণ, গরম পানির ভাপ নেওয়া বা লবণ পানিতে গার্গল করাই
অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট হতে পারে
তবে যদি জ্বর তিন দিনের বেশি
স্থায়ী হয়, শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, বুকব্যথা হয় অথবা কফের রঙ পরিবর্তিত হয়, তাহলে
অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা:
শিশু ও বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ
ক্ষমতা তুলনা মূলকভাবে কম থাকে। তাই তাদের ক্ষেত্রে ঠান্ডা এড়ানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা
বজায় রাখা এবং সামান্য উপসর্গ দেখা দিলেও দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া অত্যন্ত
জরুরি।
শেষ কথা:
শীতের জ্বর, সর্দি ও কাশি কোনো ভয়ংকর বিষয় নয়, তবে অবহেলা করলে তা জটিল আকার ধারণ করতে পারে। সচেতন জীবনযাপন, সুষম খাদ্যাভ্যাস ও সময়মতো চিকিৎসাই শীতকালীন অসুস্থতা থেকে সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সুস্থতা হঠাৎ করে পাওয়া কোনো ঘটনা নয়—এটি প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্নের সম্মিলিত ফল।
সচেতনতায়
ডা. মো: মারুফ হাসান
এমবিবিএস জেনারেল প্রাকটিশনার
০১৬৩৩০৬৭৭৮৮


অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url